وَإِذَا لَقُوا۟ ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ قَالُوٓا۟ ءَامَنَّا وَإِذَا خَلَوْا۟ إِلَىٰ شَيَٰطِينِهِمْ قَالُوٓا۟ إِنَّا مَعَكُمْ إِنَّمَا نَحْنُ مُسْتَهْزِءُونَ (14) ٱللَّهُ يَسْتَهْزِئُ بِهِمْ وَيَمُدُّهُمْ فِى طُغْيَٰنِهِمْ يَعْمَهُونَ (15)

অনুবাদঃ ডঃ মুহাম্মদ মুজিবুর রহমান

(১৪) এবং যখন তারা মু’মিনদের সাথে মিলিত হয় তখন তারা বলেঃ আমরা বিশ্বাস স্থাপন করেছি; এবং যখন তারা নিজেদের দলপতি ও দুষ্ট নেতাদের সাথে গোপনে মিলিত হয় তখন বলেঃ আমরা তোমাদের সঙ্গেই আছি, আমরাতো শুধু ঠাট্টা-বিদ্রুপ ও প্রহসন করে থাকি। (১৫) আল্লাহ তাদের সঙ্গে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করছেন এবং তাদেরকে অবকাশ দিচ্ছেন। ফলে তারা নিজেদের অবাধ্যতার মধ্যে উদ্ভ্রান্ত হয়ে ফিরছে।

তাফসীরঃ

১৪-১৫ নং আয়াতের তাফসীর

ভাবার্থ এই যে এসব মুনাফিকগণ মুসলমানদের নিকট এসে নিজেদের ঈমান, বন্ধুত্ব ও মঙ্গল কামনার কথা প্রকাশ করে তাদেরকে ধোকায় ফেলতে চায়, যাতে জান ও মালের নিরাপত্তা এসে যায় এবং যুদ্ধলব্ধ মালেও ভাগ পাওয়া যায়। আর যখন নিজেদের দলে থাকে তখন তাদের হয়েই কথা বলে। শব্দের অর্থ এখানে خَلَصُوْا، ذَهَبُوْا، اِنْصَرَفُوْا এবং مَضَوْا অর্থাৎ তারা প্রত্যাবর্তন করে, পৌছে, গোপনে বা নিভৃতে থাকে এবং যায়। সুতরাং خَلَوْا এখানে اِلٰى-এর সঙ্গে مُتَعَدِّى হয়ে ফিরে যাওয়া অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন যে, اِلٰى-এর অর্থ হচ্ছে مَعَ, কিন্তু প্রথমটিই সঠিক। ইবনে জারীরের (রঃ) কথার সারাংশ এটাই। شَيَاطِيْن-এর অর্থ হচ্ছে নেতা, বড় দলপতি এবং সর্দার। যেমন ‘আহ্বার’ বা ইয়াহূদী আলেমগণ, কুরায়েশ কাফিরদের সর্দারগণ এবং কপটগণ।

হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) এবং অন্যান্য সাহাবীগণের (রাঃ) মতে شَيَاطِيْن হচ্ছে তাদের প্রধান, কাফির সর্দারগণ এবং তাদের সমবিশ্বাসী লোকও বটে। এই ইয়াহুদী নেতারাও নবুওয়াতকে অবিশ্বাস করার এবং কুরআনকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করার পরামর্শ দিতো। মুজাহিদ (রঃ) বলেনঃ شَيَاطِيْن-এর ভাবার্থ হচ্ছে তাদের সাথী সঙ্গী। তারা হয় মুশরিক ছিল, হয় মুনাফিক ছিল। কাতাদাহ (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে ঐসব লোক খারাপ কাজ ও শিরকের কাজে তাদের সর্দার ছিল। আবুল আলিয়া (রঃ), সুদ্দী (রঃ) এবং রাবী বিন আনাসও (রঃ) এ তাফসীরই করে থাকেন। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, প্রত্যেক পথভ্রষ্টকারী ও অবাধ্যকে شَيْطَان বলা হয়। তারা। জ্বিন বা দানব থেকেই হোক অথবা মানব থেকেই হোক। কুরআন কারীমের মধ্যেও এসেছেঃ (৬:১১২) وَ كَذٰلِكَ جَعَلْنَا لِكُلِّ نَبِیٍّ عَدُوًّا شَیٰطِیْنَ الْاِنْسِ وَ الْجِنِّ হাদীস শরীফে এসেছেঃ ‘আমরা জ্বিন ও মানুষের শয়তান হতে আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাচ্ছি।

হযরত আবু যার (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেনঃ হে আল্লাহর রাসূল! মানুষের মধ্যে কি শয়তান আছে? তিনি উত্তরে বলেনঃ হাঁ যখন এই মুনাফিকরা মুসলমানদের সঙ্গে মিলিত হয় তখন বলেঃ “আমরা তো তোমাদের সঙ্গেই আছি, অর্থাৎ যেমন তোমরা, তেমনই আমরা, আমরা তো তাদেরকে উপহাস করছিলাম।’ হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), হযরত রাবী বিন আনাস (রঃ) এবং হযরত কাতাদাহ (রঃ) -এর তাফসীরও এটাই। মহান আল্লাহ তাদেরকে উত্তর দিতে গিয়ে তাদের প্রতারণামূলক কার্যের মুকাবিলায় বলেন যে, আল্লাহ তাআলাও তাদেরকে উপহাস করবেন এবং অবাধ্যতার মধ্যে উদভ্রান্ত হয়ে ফিরতে দেবেন। যেমন কুরআন মাজীদের এক জায়গায় আছেঃ یَوْمَ یَقُوْلُ الْمُنٰفِقُوْنَ وَ الْمُنٰفِقٰتُ لِلَّذِیْنَ اٰمَنُوا انْظُرُوْنَا نَقْتَبِسْ مِنْ نُّوْرِكُمْ قِیْلَ ارْجِعُوْا وَرَآءَكُمْ فَالْتَمِسُوْا نُوْرًا فَضُرِبَ بَیْنَهُمْ بِسُوْرٍ لَّهٗ بَابٌ بَاطِنُهٗ فِیْهِ الرَّحْمَةُ وَ ظَاهِرُهٗ مِنْ قِبَلِهِ الْعَذَابُ

অর্থাৎ ‘কিয়ামতের দিন মুনাফিক নর ও নারী মুমিনদেরকে বলবে, একটু থামো, আমরাও তোমাদের আলো দ্বারা একটু উপকার গ্রহণ করি। বলা হবেপিছনে ফিরে আলো অনুসন্ধান কর, ফিরা মাত্রই মধ্যস্থলে একটি প্রাচীরের আড়াল দেয়া হবে, যার মধ্যে দরজা থাকবে, এর এদিকে থাকবে রহমত এবং ওদিকে থাকবে শাস্তি।’ (৫৭:১৩) অন্যত্র আল্লাহ তা’আলা ঘোষনা করেছেনঃ وَ لَا یَحْسَبَنَّ الَّذِیْنَ كَفَرُوْۤا اَنَّمَا نُمْلِیْ لَهُمْ خَیْرٌ لِّاَنْفُسِهِمْ اِنَّمَا نُمْلِیْ لَهُمْ لِیَزْدَادُوْۤا اِثْمًاۚ

অর্থাৎ কাফিরেরা যেন আমার ঢিল দেয়াকে তাদের জন্যে মঙ্গলজনক মনে। করে, তাদের পাপ আরও বেড়ে যাক এজন্যেই আমি তাদের ঢিল দিচ্ছি।’ (৩:১৭৮) সুতরাং কুরআন মাজীদের যেখানেই خَدِيْعَتْ ـ سُخْرِيَتْ ـ اِسْتِهْزَاءُ ইত্যাদি শব্দগুলো এসেছে সেখানেই ভাবার্থ হবে এটাই। অন্য একদল বলেন যে, এসব শব্দ শুধুমাত্র ভয় দেখানো এবং সতর্ক করার জন্যে এসেছে। তাদের পাপ কার্য এবং শিরক ও কুফরের জন্যে তাদেরকে তিরস্কার করা হয়েছে। মুফাসসিরগণ বলেন যে, এ শব্দগুলি শুধু তাদেরকে উত্তর দেয়ার জন্যে আনা হয়েছে। যেমন, কোন ভাল লোক কোন প্রতারকের প্রতারণা থেকে রক্ষা পেয়ে তার উপর জয়যুক্ত হওয়ার পর তাকে বলেঃ দেখ! আমি কেমন করে তোমাকে প্রতারিত করেছি। অথচ তার পক্ষ থেকে প্রতারণা হয় নাই। এরকমই আল্লাহ তাআলার কথাঃ

وَ مَكَرُوْا وَ مَكَرَ اللّٰهُ وَ اللّٰهُ خَیْرُ الْمٰكِرِیْنَ (৩:৫৪) এবং اَللهُ يَسْتَهْزِئُ بِهِمْ (২:১৫) ইত্যাদি। নচেৎ মহান আল্লাহর সত্তা প্রতারণা ও উপহাস থেকে পবিত্র। ভাবার্থ এটাও বর্ণনা করা হয়েছে যে, আল্লাহ তাদের প্রতারণা ও বিদ্রুপের উপযুক্ত প্রতিফল দেবেন। কাজেই বিনিময়ে ঐ শব্দগুলোই ব্যবহার করা হয়েছে। দু’টি শব্দের অর্থ দুই জায়গায় পৃথক পৃথক হবে। যেমন কুরআন মাজীদে আছেঃ وَ جَزٰٓؤُا سَیِّئَةٍ سَیِّئَةٌ مِّثْلُهَاۚ অর্থাৎ মন্দের বিনিময় ঐরূপ মন্দই হয়।’ (৪২:৪০) অন্যস্থানে রয়েছেঃ فَمَنِ اعْتَدٰى عَلَیْكُمْ فَاعْتَدُوْا عَلَیْهِ

অর্থাৎ যে তোমাদের উপর বাড়াবাড়ি করে তোমরাও তার উপর বাড়াবাড়ি কর।’ (২:১৯৪) তাহলে বুঝা গেল যে, প্রতিশোধ গ্রহণ করা অন্যায় নয়। বাড়াবাড়ির মুকাবিলায় প্রতিশোধ নেয়া বাড়াবাড়ি নয়। কিন্তু দুই স্থানে একই শব্দ আছে, অথচ প্রথম অন্যায় ও বাড়াবাড়ি হচ্ছে জুলুম এবং দ্বিতীয় অন্যায় ও বাড়াবাড়ি হচ্ছে সুবিচার। আর একটি ভাবার্থ এই যে, মুনাফিকরা তাদের এই নাপাক নীতি দ্বারা মুসলমানদেরকে উপহাস ও বিদ্রুপ করতো। মহান আল্লাহও তাদের সঙ্গে এইরূপই করলেন যে, দুনিয়ায় তাদেরকে তিনি নিরাপত্তা দান করলেন, তারা এতে আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেল, অথচ এটা অস্থায়ী নিরাপত্তা। কিয়ামতের দিন তাদের কোন নিরাপত্তা নেই। এখানে যদিও তাদের জান ও মাল রক্ষা পেয়ে গেল, কিন্তু আল্লাহর নিকট তারা বেদনাদায়ক শাস্তির শিকারে পরিণত হবে। ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) এই কথাটিকেই বেশী গুরুত্ব দিয়েছেন। কেননা বিনা কারণে যে ধোকা ও বিদ্রুপ হয়, আল্লাহ তা থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র। তবে প্রতিশোধ হিসেবে আল্লাহ পাকের দিকে এসব শব্দের সম্বন্ধ লাগানোতে কোন দোষ নেই।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) একথাই বলেন যে, এটা তাদের উপর প্রতিশোধ গ্রহণ ও শাস্তি। يَمُدُّهُمْ-এর অর্থ ঢিল দেয়া এবং বাড়ানো বর্ণনা করা হয়েছে। যেমন আল্লাহ রাব্বল আলামীন বলেছেনঃ اَیَحْسَبُوْنَ اَنَّمَا نُمِدُّهُمْ بِهٖ مِنْ مَّالٍ وَّ بَنِیْنَ ـ نُسَارِعُ لَهُمْ فِی الْخَیْرٰتِ بَلْ لَّا یَشْعُرُوْنَ অর্থাৎ তারা কি ধারণা করেছে যে, তাদের মাল ও সন্তানাদির আধিক্য দ্বারা তাদের জন্যে আমি মঙ্গল ও কল্যাণকেই ত্বরান্বিত করছি? বস্তুতঃ তাদের সঠিক বোধই নেই।’ (২৩:৫৫-৫৬) আল্লাহ রাব্বল ইযত আরও বলেছেনঃ سَنَسْتَدْرِجُهُمْ مِّنْ حَیْثُ لَا یَعْلَمُوْنَ অর্থাৎ এভাবেই আমি তাদেরকে ঢিল দেয়ার পর এমনভাবে টেনে ধরব যে, তারা কোন দিক-দিশাই পাবে না।’ (৬৮:৪৪) তাহলে ভাবার্থ দাঁড়াল এই যে, এদিকে এরা পাপ করছে আর ওদিকে তাদের দুনিয়ার সুখ-সম্পদ ও ধনৈশ্বর্য উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে, কাজেই এরা সুখী হচ্ছে, অথচ প্রকৃতপক্ষে এটা একটা শাস্তিই বটে। যেমন আল্লাহ তা’আলা :কুরআন পাকে বলেছেনঃ فَلَمَّا نَسُوْا مَا ذُكِّرُوْا بِهٖ فَتَحْنَا عَلَیْهِمْ اَبْوَابَ كُلِّ شَیْءٍ حَتّٰۤى اِذَا فَرِحُوْا بِمَاۤ اُوْتُوْۤا اَخَذْنٰهُمْ بَغْتَةً فَاِذَا هُمْ مُّبْلِسُوْنَ ـ فَقُطِعَ دَابِرُ الْقَوْمِ الَّذِیْنَ ظَلَمُوْا وَ الْحَمْدُ لِلّٰهِ رَبِّ الْعٰلَمِیْنَ

অর্থাৎ যখন তারা উপদেশ ভুলে গেল, তখন আমি তাদের উপর সমস্ত জিনিসের দরজা খুলে দিলাম, অতঃপর যা তাদেরকে দেয়া হলো তার উপর যখন তারা সর্বোতভাবে খুশী হলো, হঠাৎ করে অতর্কিতে আমি তাদেরকে আঁকড়ে ধরলাম, সুতরাং তারা ভীত সন্ত্রস্ত ও নিরাশ হয়ে পড়লো। অত্যাচারীদের মূলোৎপাটন করে ধ্বংস করে দেয়া হলো এবং বলা হলো যে, সমস্ত প্রশংসা বিশ্ব প্রভু আল্লাহর জন্যে।’ (৬:৪৪-৪৫)

ইমাম ইবনে জারীর (রঃ) বলেন যে, তাদেরকে ঢিল দেয়ার জন্যে এবং তাদের অবাধ্যতা ও বিদ্রোহ বাড়িয়ে দেয়ার জন্যে তাদেরকে অধিক পরিমাণে ঢিল দেয়া হয়। কোন জিনিসের সীমা ছাড়িয়ে যাওয়াকে طُغْيَان বলা হয়। যেমন আল্লাহ পাক বলেছেনঃ اِنَّا لَمَّا طَغَا الْمَآءُ حَمَلْنٰكُمْ فِی الْجَارِیَةِ

অর্থাৎ “যখন পানি সীমা ছাড়িয়ে গেল, তখন আমি তাদেরকে নৌকায় উঠালাম।’ (৬৯:১১) পথভ্রষ্টতাকে عَمْهٌ বলা হয়। সুতরাং আয়াতটির ভাবার্থ হচ্ছে এই যে, পথভ্রষ্টতা ও কুফরীর মধ্যে ডুবে গেছে এবং এই নাপাকী তাদেরকে ঘিরে ফেলেছে। এখন তারা ঐ কাদার মধ্যেই নেমে যাচ্ছে এবং ঐ নাপাকীর মধ্যে ঢুকে পড়ছে। আর এর থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার সমস্ত পথ তাদের বন্ধ হয়ে গেছে। তারা এখন পাঁকের মধ্যে আকণ্ঠ ডুবে আছে। তদুপরি তারা। বধির এবং নির্বোধ। সুতরাং তারা কিভাবে মুক্তি পেতে পারে? চোখের অন্ধত্বের জন্যে আরবী ভাষায় عَمْىٌ শব্দ ব্যবহৃত হয়, আর অন্তরের জন্যে ব্যবহৃত হয় عَمْهٌ শব্দটি। কিন্তু কখনও আবার অন্তরের জন্য عَمْىٌ ব্যবহৃত হয়ে থাকে। যেমন কুরআন পাকে আছে وَ لٰكِنْ تَعْمَى الْقُلُوْبُ الَّتِیْ فِی الصُّدُوْرِ অর্থাৎ তাদের সেই অন্তর অন্ধ যা রয়েছে তাদের সীনার মধ্যে। (২২:৪৬)

[ Red 16th Ayath ]