لَّا جُنَاحَ عَلَيْكُمْ إِن طَلَّقْتُمُ ٱلنِّسَآءَ مَا لَمْ تَمَسُّوهُنَّ أَوْ تَفْرِضُوا۟ لَهُنَّ فَرِيضَةًۚ وَمَتِّعُوهُنَّ عَلَى ٱلْمُوسِعِ قَدَرُهُۥ وَعَلَى ٱلْمُقْتِرِ قَدَرُهُۥ مَتَٰعًۢا بِٱلْمَعْرُوفِۖ حَقًّا عَلَى ٱلْمُحْسِنِينَ (236)
অনুবাদঃ ডঃ মুহাম্মদ মুজিবুর রহমান
(২৩৬) যদি তোমরা স্ত্রীদেরকে স্পর্শ না করে অথবা তাদের প্রাপ্য নির্ধারণ করার পূর্বে তালাক প্রদান কর তাহলে তাতে তোমাদের কোন দোষ নেই, এবং তোমরা তাদেরকে কিছু সংস্থান করে দিবে, অবস্থাপন্ন লোক নিজের অবস্থানুসারে এবং অভাবগ্রস্ত লোক তার সাধ্যানুসারে বিহিত সংস্থান (করে দিবে); সৎ কর্মশীল লোকদের উপর ইহাই কর্তব্য।
তাফসীরঃ
বিবাহ বন্ধনের পর সহবাসের পূর্বে ও তালাক দেয়ার বৈধতার কথা বলা হচ্ছে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ), তাউস (রঃ), ইবরাহীম (রঃ) এবং হাসান বসরী (রঃ) বলেন যে, এখানে مَسٌّ শব্দের অর্থ বিবাহ। সহবাসের পূর্বে তালাক দেয়া, এমন কি মোহর নির্ধারিত না থাকলেও তালাক দেয়া বৈধ। তবে এতে স্ত্রীদের খুবই মনঃকষ্ট হবে বলে স্বামীদেরকে নির্দেশ দেয়া হচ্ছে যে, তারা যেন তাদের অবস্থা অনুপাতে তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীদেরকে কিছু অর্থ সাহায্য করে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, ওর সর্বোচ্চ অংশ হচ্ছে গোলাম ও নীচে হচ্ছে চাদী এবং সর্বনিম্ন হচ্ছে কাপড়। অর্থাৎ ধনী হলে গোলাম ইত্যাদি তাকে প্রদান করবে। আর যদি গরীব হয় তবে কমপক্ষে তিন খানা কাপড় দেবে। হযরত শাবী (রঃ) বলেন যে, তার জন্যে মধ্যম শ্রেণীর উপকারী বস্তু হবে জামা, দোপাট্টা, লেপ এবং চাদর।
শুরাইহ (রঃ) বলেন যে, পাঁচশো দিরহাম প্রদান করবে। ইবনে সীরীন (রঃ) বলেন যে, গোলাম দেবে বা খাদ্য অথবা কাপড় দেবে। হযরত হাসান বিন আলী (রাঃ) তাঁর তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীকে দশ হাজার দিয়ে ছিলেন। কিন্তু তিনি বলেছিলেন যে, এই প্রেমাস্পদের বিচ্ছেদের তুলনায় এটা অতি নগণ্য। ইমাম আবু হানীফার উক্তি এই যে, যদি এই উপকারী বস্তুর পরিমাণ নিয়ে উভয়ের মধ্যে বিতর্কের সৃষ্টি হয় তবে তার বংশের নারীদের যে মোহর রয়েছে তার অর্ধেক প্রদান করবে। হযরত ইমাম শাফিঈ (রঃ) বলেনঃ কোন নির্দিষ্ট জিনিসের উপর স্বামীকে বাধ্য করা যাবে না। বরং কমপক্ষে যে জিনিসকে ‘মাতআ’ অর্থাৎ উপকারের বস্তু বা আসবাবপত্র বলা হয় ওটাই যথেষ্ট হবে। আমার মতে ঐ কাপড়কে ‘মাতআ’ বলা হবে যে কাপড়ে নামায পড়া জায়েয হয়ে থাকে।’
ইমাম শাফিঈর (রঃ) প্রথম উক্তি ছিল এইঃ এর সঠিক পরিমাণ আমার জানা নেই। কিন্তু আমার নিকট পছন্দনীয় এই যে, কমপক্ষে ত্রিশ দিরহাম দিতে হবে।’ এটা হযরত আবদুল্লাহ বিন উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে। প্রত্যেক তালাকপ্রাপ্তা নারীকেই কিছু না কিছু আসবাবপত্র দেয়া উচিত, না শুধুমাত্র সহবাস করা হয়নি এরূপ নারীদেরকেই দিতে হবে এ সম্বন্ধে বহু উক্তি রয়েছে। কেউ কেউ তো সবারই জন্যে বলে থাকেন। কেননা কুরআন কারীমের মধ্যে রয়েছে وَ لِلْمُطَلَّقٰتِ مَتَاعٌۢ بِالْمَعْرُوْفِ অর্থাৎ তালাকপ্রাপ্তাদের বিহিতের সঙ্গে ‘মাতআ’ রয়েছে (২:২৪১।’ এই আয়াতটি সাধারণ। সুতরাং প্রত্যেকের জন্যেই এটা সাব্যস্ত হচ্ছে। অনুরূপভাবে নিম্নের আয়াতটিও তাদের দলীল : “হে নবী (সঃ)! তুমি তোমার স্ত্রীদেরকে বলে দাও তোমরা যদি ইহলৌকিক জীবন ও তার সৌন্দর্য কামনা কর তবে এসো, আমি তোমাদেরকে কিছু আসবাব দেই এবং বিহিতভাবে পরিত্যাগ করি।’ সুতরাং এই সমুদয় সতী সাধ্বী নারী তাঁরাই ছিলেন যাদের মোহর নির্ধারিত ছিল এবং যারা মহানবী (সঃ)-এর সহধর্মিণী হওয়ার গৌরব অর্জন করেছিলেন। সাঈদ বিন যুবাইর (রঃ), আবুল আলিয়া (রঃ) এবং হাসান বসরী (রঃ)-এরও উক্তি এটাই। এটাই ইমাম শাফিঈরও (রঃ) একটি উক্তি। কেউ কেউ তো বলেন যে, এটাই তার নতুন ও সঠিক উক্তি। কেউ কেউ বলেন যে, ঐ তালাকপ্রাপ্তা নারীকে আসবাব দেয়া কর্তব্য যার সাথে নির্জন ঘরে অবস্থান করা হয়েছে, যদিও তার জন্যে মোহর ধার্য করা হয়ে থাকে। যেমন কুরআন কারীমে রয়েছে یٰۤاَیُّهَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوْۤا اِذَا نَكَحْتُمُ الْمُؤْمِنٰتِ ثُمَّ طَلَّقْتُمُوْهُنَّ مِنْ قَبْلِ اَنْ تَمَسُّوْهُنَّ فَمَا لَكُمْ عَلَیْهِنَّ مِنْ عِدَّةٍ تَعْتَدُّوْنَهَا فَمَتِّعُوْهُنَّ وَ سَرِّحُوْهُنَّ سَرَاحًا جَمِیْلًا
অর্থাৎ “হে ঈমানদারগণ! যখন তোমরা বিশ্বাস স্থাপনকারিণী নারীদেরকে বিয়ে কর, অতঃপর তাদেরকে স্পর্শ করার পূর্বেই তালাক প্রদান কর, তখন তোমাদের পক্ষ হতে তাদের কোন ইদ্দত নেই যা তারা অতিবাহিত করবে, তোমরা তাদেরকে কিছু আসবাবপত্র দিয়ে দাও এবং বিহিতভাবে পরিত্যাগ কর।’ (৩৩:৪৯)।
সাঈদ বিন মুসাইয়াবের (রঃ) উক্তি এই যে, সূরা-ই-আহযাবের এই আয়াতটি সূরা-ই-বাকারার এই আয়াত দ্বারা রহিত হয়ে গেছে। হযরত সালাহ বিন সা’দ (রাঃ) এবং হযরত আবু উসায়েদ (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত উমাইমাহ বিনতে শুরাহবিল (রাঃ)-কে বিয়ে করেন। তিনি বিদায় নিয়ে আসলে রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর দিকে হাত বাড়িয়ে দেন। কিন্তু তিনি যেন সেটাকে খারাপ মনে করেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত উসায়েদ (রাঃ)-কে বলেনঃ “তাকে দুখানা নীল কাপড় দিয়ে বিদায় করে দাও।’ তৃতীয় উক্তি এই যে, শুধুমাত্র সেই অবস্থায় স্ত্রীকে মাতআ’ দিতে হবে যখন তাকে সহবাসের পূর্বে তালাক দেয়া হবে এবং মোহর নির্ধারিত না থাকবে। আর যদি সহবাস হয়ে যায়, মোহর-ই-মিসাল’ অর্থাৎ তার বংশের স্ত্রী লোকদের জন্যে যে মোহর ধার্য রয়েছে ওটাই দিতে হবে। এটা ঐ সময় যখন মোহর ধার্য করা থাকবে না। আর যদি ধার্য হয়ে থাকে এবং সহবাসের পূর্বে তালাক দিয়ে দেয় তবে অর্ধেক মোহর দিতে হবে। কিন্তু যদি সহবাস হয়ে গিয়ে থাকে তবে পুরো মোহরই দিতে হবে। আর এটাই মাতআ’র বিনিময় হয়ে যাবে। হাঁ, ঐ বিপদস্তা স্ত্রীর জন্যে মাতআ’ রয়েছে যার সাথে সহবাসও হয়নি এবং মোহরও ধার্য করা হয়নি- এমন অবস্থায় তালাক দেয়া হয়েছে।
হযরত ইবনে উমার (রাঃ) এবং মুজাহিদের (রঃ) উক্তি এটাই। তবে কোন কোন আলেম প্রত্যেক তালাকপ্রাপ্তা নারীকেই কিছু না কিছু দেয়া মুস্তাহাব বলে থাকেন। কিন্তু যাদেরকে সহবাসের পূর্বে তালাক দেয়া হবে এবং মোহর ধার্য করা থাকবে না তাদেরকে তো অবশ্যই দিতে হবে। ইতিপূর্বে সূরা-ই-আহযাবের যে আয়াতটির বর্ণনা দেয়া হয়েছে তার ভাবার্থ এটাই। এজন্যেই এখানে এই নির্দিষ্ট অবস্থার কথা বলা হচ্ছে যে, ধনী তার অবস্থা অনুপাতে প্রদান করবে এবং গরীবও তার অবস্থা অনুপাতে প্রদান করবে। হযরত শাবী (রঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হয় : “যে ব্যক্তি তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীকে এই মাতআ’ অর্থাৎ সংস্থানের ব্যবস্থা করে না দেবে তাকে কি আল্লাহ তা’আলার নিকট দায়ী থাকতে হবে: তিনি উত্তরে বলেনঃ “নিজের ক্ষমতা অনুসারে দিতে হবে। আল্লাহর শপথ! এই ব্যাপারে কাউকেও দায়ী থাকতে হবে না। যদি এটা ওয়াজিব হতো তবে বিচারকগণ অবশ্যই এরূপ লোককে বন্দী করতেন।
