أَمْ حَسِبْتُمْ أَن تَدْخُلُوا۟ ٱلْجَنَّةَ وَلَمَّا يَأْتِكُم مَّثَلُ ٱلَّذِينَ خَلَوْا۟ مِن قَبْلِكُمۖ مَّسَّتْهُمُ ٱلْبَأْسَآءُ وَٱلضَّرَّآءُ وَزُلْزِلُوا۟ حَتَّىٰ يَقُولَ ٱلرَّسُولُ وَٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ مَعَهُۥ مَتَىٰ نَصْرُ ٱللَّهِۗ أَلَآ إِنَّ نَصْرَ ٱللَّهِ قَرِيبٌ (214)
অনুবাদঃ ডঃ মুহাম্মদ মুজিবুর রহমান
(২১৪) তোমরা কি মনে করেছ যে, তোমরাই জান্নাতে প্রবেশ করবে? অথচ তোমরা এখনও তাদের অবস্থা প্রাপ্ত হওনি যারা তোমাদের পূর্বে বিগত হয়েছে; তাদেরকে বিপদ ও দুঃখ স্পর্শ করেছিল এবং তাদেরকে প্রকম্পিত করা হয়েছিল; এমন কি রাসূল ও তৎসহ বিশ্বাস স্থাপনকারীগণ বলেছিলঃ কখন আল্লাহর সাহায্য আসবে? সতর্ক হও, নিশ্চয়ই আল্লাহর সাহায্য নিকটবর্তী।
তাফসীরঃ
ভাবার্থ এই যে,পরীক্ষার পূর্বে বেহেশতে প্রবেশের আশা করা ঠিক নয়। পূর্ববর্তী সমস্ত উম্মতেরই পরীক্ষা নেয়া হয়েছিল। তাদেরকেও রোগ ও বিপদাপদ স্পর্শ করেছিল। بَاْسَاءُ শব্দটির অর্থ দারিদ্র এবং ضَرَّاءُ শব্দটির অর্থ রোগও ধরা হয়েছে। তাদেরকে শত্রুর ভয় এমন আতংকিত করে তুলেছিল যে, তারা কম্পিত হয়েছিল। ঐ সমুদয় পরীক্ষায় তারা সফলতা লাভ করেছিল। ফলে তারা বেহেশতের উত্তরাধিকারী হয়েছিল। সহীহ হাদীসে রয়েছে যে, একদা হযরত খাব্বাব বিন আরাত (রাঃ) বলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আপনি কি আমাদের সাহায্যের জন্যে প্রার্থনা করেন না:’ তিনি বলেন, এখনই ভীত হয়ে পড়লে: জেনে রেখো যে, পূর্ববর্তী একতুবাদীদের মস্তোকোপরি করাত রেখে তাদেরকে পা পর্যন্ত ফেঁড়ে দ্বিখণ্ডিত করে দেয়া হতো, কিন্তু তথাপি তারা তাওহীদ ও সুন্নাত হতে সরে পড়তো না। লোহার চিরুণী দিয়ে তাদের দেহের গোত আঁচড়া হতো, তথাপি তারা আল্লাহর দ্বীন পরিত্যাগ করতো না। আল্লাহর শপথ! আমার এই দ্বীনকে আল্লাহ এমন পরিপূর্ণ করবেন যে, একজন অশ্বারোহী ‘সুনআ’ হতে ‘হাযারা মাওত পর্যন্ত নির্ভয়ে ভ্রমণ করবে এবং একমাত্র আল্লাহর ভয় ছাড়া তার আর কোন ভয় থাকবে না। তবে অন্তরে এই ধারণা হওয়া অন্য কথা যে, হয়তো তার বকরীর উপরে বাঘ এসে পড়বে। কিন্তু আফসোস! তোমরা তাড়াতা
কুরআন মাজীদের মধ্যে ঠিক এই ভাবটিই অন্য জায়গায় নিম্নলিখিতভাবে বর্ণিত হয়েছে الٓمّٓ ـ اَحَسِبَ النَّاسُ اَنْ یُّتْرَكُوْۤا اَنْ یَّقُوْلُوْۤا اٰمَنَّا وَ هُمْ لَا یُفْتَنُوْنَ ـ وَ لَقَدْ فَتَنَّا الَّذِیْنَ مِنْ قَبْلِهِمْ فَلَیَعْلَمَنَّ اللّٰهُ الَّذِیْنَ صَدَقُوْا وَ لَیَعْلَمَنَّ الْكٰذِبِیْنَ
অর্থাৎ মানুষেরা কি মনে করছে যে, তারা ‘আমরা ঈমান এনেছি একথা বললেই তাদেরকে ছেড়ে দেয়া হবে এবং তাদেরকে পরীক্ষা করা হবে না: আর অবশ্যই আমি তাদের পূর্ববর্তীদেরকেও পরীক্ষা করেছিলাম, সুতরাং অবশ্যই আল্লাহ সত্যবাদীদেরকেও জেনে নেবেন এবং নিশ্চয় যারা মিথ্যাবাদী তাদেরকেও আল্লাহ জানবেন।’ (২৯:১-৩) এভাবেই ‘পরিখার যুদ্ধে’ সাহাবা-ই-কিরামেরও পরীক্ষা নেয়া হয়েছিল। যেমন, স্বয়ং পবিত্র কুরআনই এর চিত্র এঁকেছে।
ঘোষণা হচ্ছে, যখন তারা (কাফিরেরা) তোমাদের উপরের দিক হতে এবং তোমাদের নিম্ন দিক হতেও তোমাদের উপর চড়াও করেছিল এবং যখন (ভয়ে -বিস্ময়ে) চক্ষুসমূহ বিস্ফারিতই রয়ে গিয়েছিল এবং অন্তরসমূহ কণ্ঠাগত হওয়ার উপক্রম হয়েছিল, আর তোমরা আল্লাহ সম্বন্ধে নানারূপ ধারণা পোষণ করছিলে। তথায় মুসলমানদেরকে পরীক্ষা করা হয়েছিল এবং তাদেরকে প্রবল প্ৰকম্পে নিক্ষেপ করা হয়েছিল। যখন মুনাফিকরা এবং যাদের অন্তরে ব্যাধি রয়েছে তারা বলেছিল-আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলতো আমাদেরকে শুধু প্রবঞ্চনামূলক ওয়াদাই দিয়েছেন।’
রোমক সম্রাট হিরাক্লিয়াস যখন হযরত আবু সুফিয়ান (রাঃ)-কে তাঁর কুফরীর অবস্থায় জিজ্ঞেস করেছিলেন, এই নবুওয়াতের দাবীদারের (মুহাম্মদ সঃ) সাথে আপনাদের কোন যুদ্ধ হয়েছিল কি’: আবু সুফিয়ান (রাঃ) বলেন, ‘হাঁ’। হিরাক্লিয়াস পুনরায় জিজ্ঞেস করেন, যুদ্ধের ফলাফল কি হয়েছিল: তিনি বলেন, ‘কখনও আমরা জয়যুক্ত হয়েছিলাম এবং কখনও তিনি। হিরাক্লিয়াস বলেন, এভাবেই নবীদের (আঃ) পরীক্ষা হয়ে আসছে। কিন্তু পরিণামে প্রকাশ্য বিজয় তাঁদেরই হয়ে থাকে। مَثَلُ শব্দটির অর্থ এখানে রীতি। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছে وَمَضٰى مَثَلُ الْاَوَّلِيْنَ অর্থাৎ পূর্ববর্তীদের রীতি অতীত হয়েছে। পূর্ব যুগের মু’মিনগণ তাঁদের নবীদের (আঃ) সাথে এরকমই কঠিন অবস্থায় আল্লাহ তা’আলার সাহায্য প্রার্থনা করেছিলেন এবং সেই সঠিক ও সংকীর্ণ অবস্থা হতে মুক্তি চেয়েছিলেন। উত্তরে তাঁদেরকে বলা হয়েছিল যে, সাহায্য অতি নিকটবতী। যেমন অন্য স্থানে রয়েছে فَاِنَّ مَعَ الْعُسْرِ يُسْرًا অর্থাৎ “নিশ্চয় কাঠিন্যের সাথে সহজতা রয়েছে।’ (৯৪:৫) একটি হাদীসে রয়েছে যে, বান্দা যখন নিরাশ হতে থাকে তখন আল্লাহ তা’আলা বিস্মিত হয়ে বলেন-আমার সাহায্য তো এসেই যাচ্ছে, অথচ তারা নিরাশ হয়ে যাচ্ছে। সুতরাং আল্লাহ তা’আলা তাদের এই দ্রুততা এবং তাঁর দয়া নিকটবর্তী হওয়ার উপর হেসে থাকেন।
